ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরী

ভারতের বিপ্লবী আন্দোলনে যোগদানকারী নারী ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরী প্রসঙ্গে তার জন্ম, পিতামাতা, বিবাহ, বৈধব্য অবস্থা, যুগান্তর দলে যোগদান, পলাতক বিপ্লবীদের গৃহকর্ত্রী ও মা ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরী, ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরীর আশ্রয়ে বিখ্যাত বিপ্লবী, ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরীর সাহায্যে বিপ্লবী কার্যকলাপ, ক্ষীরোদাসুন্দরীকে নিয়ে বিপ্লবীদের দেওভোগে অবস্থান, ক্ষীরোদাসুন্দরীকে নিয়ে বিপ্লবীদের সরিষাবাড়ি গমন, জামালপুরে বিপ্লবীদের আশ্রয়দাত্রী ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরী, ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরীর সঙ্গে বিপ্লবীদের মাতা-পুত্রের সম্পর্ক, ধুবড়িতে বিপ্লবীদের সাথে মা ক্ষীরোদাসুন্দরী, ক্ষীরোদাসুন্দরীর দায়িত্বে ও কর্ত্রীত্বে বিপ্লবী দল, বিপ্লবীদের সাথে ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরীর আসাম আগমন, আত্মীয়স্বজন কর্তৃক ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরীর খোঁজ, ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরীর কাশী গমন ও ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরীকে পুলিসের জেরা।

বিপ্লবী আন্দোলনে যোগদানকারী নারী ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরী

ঐতিহাসিক চরিত্রক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরী
দেশবাংলাদেশ
জন্ম১৮৮৩ খ্রি
জন্মস্থানময়মনসিংহ জেলা
পিতাশিবসুন্দর রায়
মাতাদুর্গা সুন্দরী দেবী
রাজনৈতিক দলযুগান্তর দল
ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরী

ভূমিকা :- ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন ব্যক্তিত্ব ও অগ্নিকন্যা ছিলেন ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরী।

ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরীর জন্ম

১৮৮৩ সালে ময়মনসিংহ জেলার সুন্দাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরী। পৈতৃকভূমি তাঁর সেখানেই।

ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরীর পিতামাতা

তার পিতার নাম শিবসুন্দর রায় এবং মাতা হলেন দুর্গা সুন্দরী দেবী।

ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরীর বিবাহ

ময়মনসিংহের খারুয়া গ্রামের ব্রজকিশোর চৌধুরীর সঙ্গে তার বিবাহ হয়।

ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরীর বৈধব্য জীবন

তাঁর যখন ৩২-৩৩ বছর বয়স তখন একটিমাত্র কন্যা নিয়ে তিনি বিধবা হন।

ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরীর যুগান্তর দলে যোগদান

বিপ্লবী ক্ষিতীশ চৌধুরী ছিলেন তার দেওরপুত্র। ক্ষিতীশ চৌধুরী এবং ময়মনসিংহের বিপ্লবী নেতা হরেন্দ্রমোহন ঘোষ (পরে বি. পি.সি.সি-ব প্রেসিডেন্ট) ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরীকে বিপ্লবী প্রতিষ্ঠান ‘যুগান্তর’ দলভুক্ত ক’রে নেন।

পলাতক বিপ্লবীদের গৃহকর্ত্রী ও মা ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরী

১৯১৬ সালের ৩০শে জুন কলকাতার গোয়েন্দা পুলিসের ডেপুটি সুপারিনটেন্ডেন্ট বসন্ত চ্যাটার্জীর হত্যার পর সুরেন্দ্রমোহন ঘোষ ও ক্ষিতীশ চৌধুরীর নামে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা বের হয়। তাঁরা ক্ষীরোদাসুন্দরী দেবীকে নিয়ে ময়মনসিংহে একটি বাড়ী ভাড়া করে পলাতক হলেন। ক্ষীরোদাসুন্দরী হয়েছিলেন পলাতকদের গৃহকর্ত্রী এবং মা।

ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরীর আশ্রয়ে বিখ্যাত বিপ্লবী

তার কিছুদিন পরে সেই আশ্রয়ে এসে রইলেন ভারত-জার্মান ষড়যন্ত্রের সর্বপ্রধান নেতা যাদুগোপাল মুখার্জী ও বিপ্লবী নলিনীকান্ত কর। যাদুগোপাল মুখার্জীর নামে তখন দশহাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা ছিল।

ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরীর সাহায্যে বিপ্লবী কার্যকলাপ

পলাতকদের এই বাডীটি ছিল পুলিস-ক্লাবের একেবারে কাছে। প্রদীপের তলায়ই হচ্ছে অন্ধকার। অত কাছে থেকেও পুলিশ অনেকদিন পর্যন্ত বৃথাই বাইরে বাইরে এঁদের খোঁজ ক’রে হয়রান হয়েছে। এই বিপ্লবীরা কিছুদিন পর্যন্ত মা ক্ষীরোদাসুন্দরীকে অবলম্বন ক’রে ময়মনসিংহে পলাতক রইলেন।

ক্ষীরোদাসুন্দরীকে নিয়ে বিপ্লবীদের দেওভোগে অবস্থান

একদিন বিপ্লবীরা পুলিসের অস্বাভাবিক তৎপরতার খবর পেলেন। তৎক্ষণাৎ সুরেন্দ্রমোহন ঘোষ বাদে এই দল মা ক্ষীরোদাসুন্দরীকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জের দেওভোগে চলে গেলেন। সেখানে মাস দুই তাঁরা অবস্থান করেন।

ক্ষীরোদাসুন্দরীকে নিয়ে বিপ্লবীদের সরিষাবাড়ি গমন

পুলিস কমিশনার টেগার্ট তখন সারা বাংলার বেড়াজাল ফেলে রেখেছে বিপ্লবী নেতা যাদুগোপাল মুখার্জী ও অন্যান্যদের গ্রেপ্তারের জন্য। এই বেড়াজাল ভেদ ক’রে ছিটকে সরে গেলেন তাঁরা মা ক্ষীরোদাসুন্দরী দেবীকে নিয়ে সরিষাবাড়ী।

জামালপুরে বিপ্লবীদের আশ্রয়দাত্রী ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরী

কিছুদিন বাদে এখানেও পুলিসের ভিতরে চাঞ্চল্য লক্ষ্য ক’রে তারা বিদ্যুৎবেগে অন্তর্হিত হলেন জামালপুরে। জামালপুরে যে বাসা ভাড়া করা হ’ল সেখানেও মা হ’য়ে আশ্রয় দিলেন ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরীই। জামালপুরের এই আশ্রয়ে রইলেন যাদুগোপাল মুখার্জী, নলিনীকান্ত কর, সতীশ ঠাকুর, নগেন্দ্রশেখর চক্রবর্তী, কুশা রায়, ক্ষিতীশ বসু ও পৃথ্বীশ বসু।

ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরীর সঙ্গে বিপ্লবীদের মাতা-পুত্রের সম্পর্ক

জামালপুরে প্রায় দেড়মাস থাকার পর সেখানকার আশ্রয়ও পুলিসের নজরে পড়ে গেছে সন্দেহে, তডিৎগতিতে এই দল পলাতক হলেন সিরাজগঞ্জে। ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরীর সঙ্গে এঁদের সম্পর্ক অন্তরে এবং বাইরে হয়েছিল মাতা-পুত্রের। অসুস্থ মায়ের কবিরাজী চিকিৎসার জন্ম যেন তাঁরা সিরাজগঞ্জে গেছেন এই কথা ছিল বাইবে প্রকাশ।

ধুবড়িতে বিপ্লবীদের সাথে মা ক্ষীরোদাসুন্দরী

প্রায় তিনমাস এখানে পলাতক থাকার পর পুনরায় তাঁরা সন্দেহ করলেন যে, পুলিস খবর পেয়ে গেছে এই আস্তানার। চক্ষের নিমেষে তাঁরা পালিয়ে গেলেন ধুবড়ীতে। পলাতক নলিনীকান্ত কর ও সতীশ ঠাকুরকে আগে থেকেই ধুবড়ীতে পাঠানো হয়েছিল সেখানে একটা ভাতের হোটেল খুলতে। সেখানে গিয়ে হঠাৎ উপস্থিত হলেন যাদুগোপাল মুখার্জী, কামিনীমোহন ঘোষ, ক্ষিতীশ বসু, পৃথ্বীশ বসু, কুশা রায়, ক্ষিতীশ চৌধুরী, নগেন্দ্রশেখর চক্রবর্তী, গিরীন্দ্রনাথ রায় এবং মা ক্ষীরোদাসুন্দরী।

ক্ষীরোদাসুন্দরীর দায়িত্বে ও কর্ত্রীত্বে বিপ্লবী দল

ঐ দুই পলাতক বিপ্লবী হোটেল-মালিকের আডালে লুকিয়ে রইলেন এতগুলি বিপ্লবী মানুষ। দুইদিন পরে তারা একটা আলাদা বাসা ভাডা ক’রে হোটেল থেকে পৃথক রইলেন। সকলেই মা ক্ষীরোদাসুন্দরীর দায়িত্বে ও কর্ত্রীত্বে পলাতক রইলেন সেই ভাড়াবাড়ীতে প্রায় দেডমাস।

বিপ্লবীদের সাথে ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরীর আসাম আগমন

তারপর এখান থেকে উধাও হয়ে ক্ষীরোদাসুন্দরী ও বিপ্লবীরা আসামের বিন্নাখাতা গ্রামের ছনখেতের মধ্যে তৈরী একটি বাড়ীতে চলে গেলেন। সাপটগ্রাম স্টেশন থেকে প্রায় ১৪ মাইল দূরে ছিল এই বিন্নাখাতা গ্রাম। প্রায় দুইমাস এখানে গৃহকর্ত্রী হয়ে ছিলেন মা ক্ষীরোদাসুন্দরী।

আত্মীয়স্বজন কর্তৃক ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরীর খোঁজ

এই সময়ে তাঁর আত্মীয়স্বজন এবং অন্যান্য সকলেই এতদিন পর্যন্ত তাঁর খবর না পেয়ে আশঙ্কিত হয়ে খোঁজ করতে আরম্ভ করেন। নানা কথা উঠতে থাকে। তখন মা ক্ষীরোদাসুন্দীকে আর আশ্রয়দাত্রীরূপে রাখা বিপ্লবীরা নিরাপদ মনে করলেন না।

ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরীর কাশী গমন

এরপর বিপ্লবীরা ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরীকে প্রথমে কাশী পাঠিয়ে দিলেন, পরে তাঁর শ্বশুরবাড়ী খারুয়াতে। কাশীতে যে বাড়ীতে তিনি কয়েকদিন ছিলেন সে-বাড়ীর একটা খাতায় তিনি নিজের নাম ও ঠিকানা লিখে রাখলেন দলের নেতাদের নির্দেশে।

ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরীকে পুলিসের জেরা

ময়মনসিংহে খারুয়ার বাড়ীতে পৌঁছবার পর পুলিশ যখন তাঁর বাড়ী ঘেরাও ক’রে তল্লাসী এবং জেরা করল তার এতদিনের অবস্থান ও কার্যকলাপ সম্পর্কে, তখন মা ক্ষীরোদাসুন্দরী অতি ভালোমানুষের মতো জবাব দিলেন যে তিনি কাশীতে ছিলেন। পুলিশ কাশীর সেই বাড়ীতে গিয়ে উপস্থিত হ’য়ে দেখল সত্যি সে-বাড়ীতে তাঁর নাম ঠিকানা লেখা রয়েছে। পুলিশ শত জেরা করেও সন্দেহ করবার মতো কিছু তার কাছ থেকে আদায় করতে না পেরে নিরাশ হয়ে ফিরে গেল।

উপসংহার :- আজ ৭৬ বছর বয়সেও তাঁর অতীত স্মৃতি মন্থন ক’রে তিনি সেই ১৯১৬, ১৯১৭ সালের কাহিনী লাজনম্রকণ্ঠে ব’লে যেতে পারেন। সেই দিনে সামাজিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ নারীর এই দুঃসাহসিক যাত্রা ও তাঁর কীর্তি পদচিহ্ন রেখে গেছে পরবর্তীকালের কর্মীদের জন্য।

(FAQ) ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরী সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরীর জন্মস্থান কোথায়?

বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার সুন্দাইল গ্ৰামে।

২. ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরীর জন্ম হয় কখন?

১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে।

৩. ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরী বিপ্লবীদের কি পরিচয়ে নিজের কাছে রাখতেন?

সন্তান।

৪. বিপ্লবীদের কাছে ক্ষীরোদাসুন্দরী চৌধুরী কি নামে পরিচিত ছিলেন?

মা।

Leave a Comment