ময়ূর সিংহাসন

মোঘল সম্রাট শাহজাহান নির্মিত ময়ূর সিংহাসন -এর নামকরণ, স্থপতি, সময়কাল, অর্থ ব্যয়, ময়ূর ব্যবহার, রত্নের ব্যবহার, সিংহাসনের বর্ণনা, পরিণতি ও তার সংরক্ষণ সম্পর্কে জানবো।

মোগল সম্রাট শাহজাহানের আমলে নির্মিত ভারতের বিখ্যাত ময়ূর সিংহাসন প্রসঙ্গে ময়ূর সিংহাসন নামকরণ, ময়ূর সিংহাসন ও তাজমহল, ময়ূর সিংহাসনের গুরুত্ব, ময়ূর সিংহাসনের শিল্লী বা নির্মাতা বা স্থপতি, ময়ূর সিংহাসন নির্মানের সময়কাল ও অর্থ ব্যয়, ময়ূর সিংহাসনে ময়ূর ব্যবহার, ময়ূর সিংহাসনের সৌন্দর্য, ময়ূর সিংহাসনে রত্নের ব্যবহার, ময়ূর সিংহাসনের বর্ণনা, ময়ূর সিংহাসনের ভূয়সী প্রশংসা, ময়ূর সিংহাসনের অবস্থান, নাদির শাহর ময়ূর সিংহাসন লুট, ময়ূর সিংহাসনের পরিণতি, ময়ূর সিংহাসন সংরক্ষণ ও ময়ূর সিংহাসনে স্থাপিত কোহিনূর হীরার পরিণতি।

সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম ময়ূর সিংহাসন

ঐতিহাসিক নিদর্শনময়ূর সিংহাসন
সময়কাল১৬২৮-১৬৩৫ খ্রিস্টাব্দ
স্থপতিবেবাদল খান
অর্থ ব্যয়তৎকালীন ৮ কোটি টাকা
নির্মাণকারীমোগল সম্রাট শাহজাহান
ময়ূর সিংহাসন

ভূমিকা :- সম্রাট শাহজাহান সাংস্কৃতিক দিক থেকে ভারতবর্ষ -এ মুঘল সাম্রাজ্যকে এক অনন্য অবস্থানে নিয়ে গেলেও ইতিহাস তাকে মনে রাখবে তার বিখ্যাত সব স্থাপত্য ও কীর্তির জন্য।

শাহজাহানের ময়ূর সিংহাসন

মোগল বাদশাহ শাহজাহানের সিংহাসনের ছিল ৭টি। এর মধ্যে ময়ূর সিংহাসনই ছিল সবচেয়ে দামী ও জমকালো।

ময়ূর সিংহাসনের নামকরণ

সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম ময়ূর সিংহাসন বা তখত তাউস দুনিয়ার সবথেকে দামী সিংহাসন হিসাবে দাবি করা হয়। ফারসিতে একে বলা হত ‘তখত-ই-তাউস’। তখত শব্দের অর্থ সিংহাসন, আর তাউস শব্দের অর্থ হল ময়ূর।

ময়ূর সিংহাসন

তার সময়েই মুঘল স্থাপত্যবিদ্যা সবথেকে বেশি সমৃদ্ধি লাভ করে এবং তিনি ছিলেন এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক। তবে তার একটি মহাকীর্তি নিয়ে তূলনামূলক কম আলোচনা হয় – ময়ূর সিংহাসন। সম্ভবত ভারতবর্ষে এর উপস্থিতি না থাকার কারণেই এমন হয়ে থাকে।

তাজমহল ও ময়ূর সিংহাসন

আগ্রার তাজমহলের থেকেও দ্বিগুণ অর্থ ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল এই সিংহাসনটি। এটি ছিল দুর্লভ স্বর্ণ, হীরা ও মরকত মণিখচিত।

ময়ূর সিংহাসনের গুরুত্ব

তাজমহল কিংবা সম্রাট শাহজাহানের শাসনকালে নির্মিত অন্যান্য স্থাপত্য ও কীর্তির তুলনায় ময়ূর সিংহাসনের গুরুত্ব বা মূল্য কিন্তু কোনো অংশেই কম নয়।

ময়ূর সিংহাসনের স্থপতি

বেবাদল খাঁর তত্ত্বাবধানে নির্মান করা হয় এই সিংহাসনটি।

ময়ূর সিংহাসনের সময়কাল ও অর্থ ব্যয়

প্রায় আট বছর (১৬২৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৬৩৫ খ্রিস্টাব্দ) তৎকালীন আট কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মান করা হয় এই ময়ূর সিংহাসনটি।

ময়ূর সিংহাসন বিষয়ে সম্রাট শাহজাহানের লক্ষ্য

এই সিংহাসন মুঘল সাম্রাজ্যের পরিচয়বাহী একটি কীর্তি হয়ে উঠবে, মুঘলদের ঐশ্বর্য সম্পর্কে বাইরের দুনিয়াকে ধারণা দেবে – এই ধরনের চিন্তাই ছিল সম্রাট শাহজাহানের মনে।

ময়ূর সিংহাসনে ময়ূর ব্যবহার

  • (১) মুঘল আমলে শিল্প-সাহিত্যে ময়ূরের এক অনন্য স্থান ছিল, যা অন্য কোনো প্রাণীর ছিল না। মুঘল আমলে অঙ্কিত চিত্রকর্মগুলিতে ময়ূরের অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হত সুনিপুণভাবে।
  • (২) তখনকার সাহিত্যেও ময়ূরকে এক আধ্যাত্মিক রূপ দান করা হয়। যেমন – শামস-ই-তাবাসি নামে একজন কবি তার কাব্যগ্রন্থে দাবি করেন যে বেহেশতের সবচেয়ে উঁচু স্তরে থাকবে ময়ূর।
  • (৩) যেহেতু ময়ূরকে ধর্মীয়ভাবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভাবা হত, তাই মুঘল শাসনকালে সাধারণের বিশ্বাস ছিল যে, কোনোভাবে এই পাখির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলে অবশ্যই সৃষ্টিকর্তা ভালো কিছু করবেন।
  • (৪) তাই ধারণা করা হয়ে থাকে যে, সম্রাট শাহ জাহান ধর্মীয় কারণেই তার বিখ্যাত সিংহাসনের পেছনে দুটো ময়ূরের অবয়ব তৈরি করিয়েছিলেন। আর এই পাখির নামেই পরবর্তীতে সিংহাসনটি পরিচিতি লাভ করে।

ময়ূর সিংহাসনের সৌন্দর্য

এই সিংহাসনের পেছনে যে দুটি ময়ূর ছিল তাদের লেজ ছিল ছড়ানো। ফলে সিংহাসনের সৌন্দর্য বহুগুণ বর্ধিত হয়েছিল।

ময়ূর সিংহাসনে রত্নের ব্যবহার

  • (১) আনুমানিক ১১৫০ কেজি সোনা ও প্রায় ২৩০ কেজি বিভিন্ন মহামূল্যবান পাথর ব্যবহার করা হয়েছিল এই রাজকীয় সিংহাসন তৈরি করার জন্য।
  • (২) তিমুর রুবি ও বিখ্যাত কোহিনূর হীরার মতো দুর্লভ জিনিস ব্যবহার করা হয় এই সিংহাসনে।
  • (৩) বিভিন্ন যুদ্ধজয়ের মাধ্যমে যেসব দামী ও দুর্লভ অলংকার মুঘল রাজকোষে জমা হয়েছিল, সেগুলো দিয়েই এই সিংহাসনের নির্মাণকাজ করা হয়।
  •  (৪) ১১৬টি পান্না, ১০৮টি রুবি ও আরও অসংখ্য মূল্যবান পাথর ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে অনেকগুলি ছিল অত্যন্ত দুর্লভ।

শাহজাহানের ময়ূর সিংহাসনের বর্ণনা

  • (১) ময়ূর সিংহাসনের ৪টি পায়া ছিল নিরেট স্বর্ণ দ্বারা নির্মিত। ১২টি মরকত মনি স্তম্ভের উপর চন্দ্রতাপ ছাদ আচ্ছাদন করা হয়। ছাদের চারদিকে মিনা করা মণি মুক্তা বসানো ছিল। এর ভেতরের দিকের সবটাই মহামূল্যবান চুন্নি ও পান্না দ্বারা মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
  • (২) প্রত্যেক স্তম্ভের মাথায় মণি-মাণিক্য খচিত এক জোড়া ময়ূর মুখোমুখি বসানো হয়েছিল। প্রতি জোড়া ময়ূরের মধ্যস্থলে একেকটি মণি-মাণিক্য নির্মিত গাছ ছিল। যা দেখলে মনে হত, ময়ূর দুটি ঠুকরে গাছের ফল খাচ্ছে।
  • (৩) বিভিন্ন নকশার মধ্যেকার ফাঁকা অংশটুকুও ভরাট করা হয়েছিল ক্ষুদ্রাকৃতির হিরা দিয়ে। হিরা ও পান্নার কারুকাজ বিশিষ্ট ৩টি সিঁড়ির সাহায্যে সিংহাসনে ওঠা-নামার ব্যবস্থা ছিল।
  • (৪) সিংহাসনের উপরে চাঁদোয়ার চারকোণে বসানো হয়েছিল সারিবদ্ধ মুক্তা। চাঁদোয়াটির নিচেও ছিল হিরা আর মুক্তার বাহারি নকশা। এছাড়াও বিরাট আকারের চুনি বসানো ছিল ময়ূরের বুকে।
  • (৫) নীল রঙের মণি দিয়ে সাজানো হয়েছিল ময়ূরের লেজ। সিংহাসনটিতে বসার জন্য ভিন্ন ভিন্ন দিকে অগণিত মণি মুক্তা শোভা পেত।

ময়ূর সিংহাসনের ভূয়সী প্রশংসা

জ্যাঁ ব্যাপ্টিস্ট তাভার্নিয়ার নামে একজন ফরাসি অলংকারিক ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে মোগল রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করে ময়ূর সিংহাসন প্রত্যক্ষ করার পর তার চোখ কপালে উঠে যায়। তার কথায়,

“সিংহাসনটি ছিল বিছানাকৃতির। এতে চারটি পায়া ছিল, যেগুলো ছিল খাঁটি সোনার তৈরি। সিংহাসনের উপরের ছাউনি হিসেবে ব্যবহার করা বহুমূল্য কাপড়টি ধরে রাখতে বারটি ছোট খুঁটি ছিল। ছাউনি হিসেবে ব্যবহার করা কাপড় ধরে রাখতে যে বারোটি খুঁটি ছিল, সেগুলো ছিল সবচেয়ে মূল্যবান, কারণ সেগুলোতে বিভিন্ন দুর্লভ পাথর ও হীরা ব্যবহার করা হয়েছিল।”

ময়ূর সিংহাসনে অবস্থান

  • (১) মুঘল সম্রাট শাহজাহানের দ্বারা নির্মিত সম্রাটদের বাসস্থান হিসেবে ব্যবহৃত দিওয়ান-ই-খাসে সাধারণত এই ময়ূর সিংহাসন রাখা হত। কিন্তু অনেক সময় দিওয়ান-ই-আমেও একে নিয়ে আসা হত।
  • (২) এছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও উৎসবের জন্য যখন সম্রাটকে দিল্লি থেকে আগ্রায় আসতে হত তখন তার সাথে এই সিংহাসনও বহন করে নিয়ে আসা হত।

নাদির শাহের ময়ূর সিংহাসন লুট

১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে পারস্যের শাসক নাদির শাহ দিল্লির মোগল সাম্রাজ্যের উপর আক্রমণ করেন। মোগল সম্রাট পরাজিত হলে তিনি ময়ূর সিংহাসন ও কোহিনূর হীরা লুট করে পারস্যে নিয়ে যান।

ময়ূর সিংহাসনের পরিণতি

  • (১) নাদির শাহের মৃত্যুর পর রাজপ্রাসাদে লুটের ঘটনা ঘটে। অনেকে বলে থাকেন, লুটেরা ব্যক্তিরা অরাজকতার মাঝে রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করে ময়ূর সিংহাসন ভেঙে ফেলে এবং ভাঙা টুকরোগুলি পরবর্তীতে চড়া দামে বিক্রি করে।
  • (২) আবার অনেকে মনে করেন যে, নাদির শাহ যখন ভারতবর্ষ থেকে নিয়ে যাওয়ার সময়ই ময়ূর সিংহাসন ভেঙে টুকরো টুকরো করে হাতির পিঠে ইরানের উদ্দেশ্য রওনা দেন এবং লুটেরা ব্যক্তিরা ইরানের রাজপ্রাসাদ থেকে এই টুকরোগুলিই লুট করে।

ময়ূর সিংহাসন সংরক্ষণ

ব্রিটেনের একটি যাদুঘরে ময়ূর সিংহাসনের একটি পায়া সংরক্ষিত আছে। মোগল সাম্রাজ্যের অনুকরণে পরবর্তীতে ইরানেও ময়ূর সিংহাসন তৈরি করা হয়, যা বর্তমানে তেহরান যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।

ময়ূর সিংহাসনে স্থাপিত কোহিনূর হীরার পরিণতি

প্রাচীনকালের সুন্দরী কুমারীর মতো ময়ূর সিংহাসনে স্থান পাওয়া দূর্লভ রত্ন বিখ্যাত কোহিনূর হীরাটিও বিভিন্ন রাজা বাদশাহ ও শাসকের হাত ঘুরে এখন স্থান পেয়েছে ইংল্যান্ড -এর টাওয়ার অফ লন্ডনে।

উপসংহার :- ময়ূর সিংহাসন যতই লুটেরাদের হাতে ক্ষত-বিক্ষত হোক অথবা যতই বিদেশি শক্তির হাতে অর্পিত হোক না কেন, এই অনিন্দ্যসুন্দর কীর্তির জন্য ইতিহাস সবসময় সম্রাট শাহজাহানকেই স্মরণ করবে।


প্রিয় পাঠক/পাঠিকা আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ সময় করে আমাদের এই “ময়ূর সিংহাসন” পোস্টটি পড়ার জন্য। এই ভাবেই adhunikitihas.com ওয়েবসাইটের পাশে থাকুন। যেকোনো প্রশ্ন উত্তর জানতে এই ওয়েবসাইট টি ফলো করুণ এবং নিজেকে  তথ্য সমৃদ্ধ করে তুলুন।

সবশেষে আপনার কাছে আমাদের অনুরোধ যদি এই পোস্টটি আপনার ভালো লেগে থাকে তাহলে Comment ও Share করে দিবেন, (ধন্যবাদ)।

(FAQ) ময়ূর সিংহাসন সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ময়ূর সিংহাসনের শিল্পী কে ছিলেন?

বেবাদল খান।

২. ময়ূর সিংহাসন কে কখন লুট করেন?

১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে পারস্যের নাদির শাহ।

৩. ময়ূর সিংহাসন কার জন্য নির্মিত হয়?

মোগল সম্রাট শাহজাহান।

৪. ময়ূর সিংহাসন কে নির্মান করেন?

বেবাদল খান।

৫. ময়ূর সিংহাসন কে তৈরি করেন?

বেবাদল খান।

Leave a Comment